শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০, ০১:৪২ অপরাহ্ন

সিলেটে করোনা স্পর্শ করেনি ৪০ হাজার আদিবাসীর ৯০টি পুঞ্জিতে

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার ) প্রতিনিধি:
  • প্রকাশকালঃ বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

দেশে গত মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে করোনায় আক্রান্ত হতে থাকে মানুষ। কিন্তু ব্যতিক্রম দেখা যায় একমাত্র সিলেট বিভাগের আদিবাসী অধ্যুষিত ৯০টি পুঞ্জিতে। গতকাল পর্যন্ত এই ৯০টি পুঞ্জিতে কোন কোভিড-১৯ রোগী পাওয়া যায়নি। এমনকি কোভিড-১৯ (করোনা) আক্রান্ত হয়ে বা এই উপসর্গে কোন রোগীও মারা যাননি।

কুবরাজ আন্ত:পুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠন (পুঞ্জিবাসীদের অধিকার আদায়ের সংগঠন) থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, সিলেট বিভাগের তাদের জনসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। পুঞ্জির সংখ্যা ৯০টি। পুঞ্জি গুলিতে কোভিড-১৯ (করোনা) মুক্ত রাখতে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন আদিবাসী নেতৃবৃন্দ। তারা এক পুঞ্জি থেকে অন্য পুঞ্জিতে ছুটে বেড়াচ্ছেন এবং কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা যায় তার পরামর্শ দিচ্ছেন।

পুঞ্জিতে সাধারণত একজন মন্ত্রী (প্রধান ব্যক্তি) থাকেন। তাকে নিয়ে নিয়মিত সভা করছেন প্রতিটি পুঞ্জিতে এবং কীভাবে মাস্ক পড়া, সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করা, সরকারের নির্দেশ মতো, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন। এরই সাথে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা, নিয়মিত হাত ধোঁয়া ইত্যাদি বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। ডাল, চাল কিনে আনার পর জীবানুনাশক স্প্রে করা হয় এবং পুঞ্জির প্রবেশ পথের সম্মুখের একটি বাড়ীতে সংরক্ষন করে রাখা হয় যেন করোনা ভাইরাস পুঞ্জিতে ছড়িতে পড়তে না পারে।

সিলেট বিভাগের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান বলেন, গত ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিলেটে মোট করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে ১০ হাজার ৮৮ জন। এদের মধ্যে মারা গেছেন ১৮৭ জন। অথচ আশ্চর্যজনক সত্য হলো পুঞ্জিতে বসবাসকারী কোন আদিবাসীর করোনা সংক্রমণ হয়নি। এসব আদিবাসী মানুষ সঠিক ভাবে লকডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কারণেই আজ পর্যন্ত কোন কভিড-১৯ বা করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়নি।

তারা সচেতনতার সহিত সরকারের নির্দেশ মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কারণে এবং ব্যক্তিগত ভাবে সচেতন থাকায় এর সুফল উপভোগ করছেন। তিনি পুঞ্জিতে সম্পন্ন লকডাউন ও স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলাকে অনুকরণীয় বলে মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন “এটি একটি ভালো অনুশীলন, সবাই এটি উদাহরণ হিসেবে নিয়ে অনুসরণ করতে পারেন”।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ইসলাছড়া পুঞ্জির বাসিন্দা দিপু রেমা বলেন, তারা তাদের এলাকায় বসবাসরত সবার সাথে নিয়মিত সভা করেছেন যাতে কাউকে কোন বিশেষ ছাড় দেওয়া না হয়। করোনা যদি আমাদের এলাকায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয় তবে আমরা প্রত্যেকেই মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবো। এ জন্য আমরা এসব কাজ করছি।

কুলাউড়া উপজেলার অপর আরেকটি পুঞ্জির মন্ত্রী (পুঞ্জি প্রধান) মনিকা খংলা বলেন, করোনার বিরুদ্ধে সতর্কতা হিসেবে বাইরে থেকে কিনে আনা চাল ও ডালের বস্তায় জীবানুনাশক স্প্রে ছিড়ানো হয় এবং পুঞ্জির প্রবেশ পথ সংলগ্ন একটি ঘরে এক সপ্তাহ রাখা হয়। যাতে জীবানুগুলো মারা যায়।

সিলেট ডায়োসিসের প্রধান বিশপ বিজয় এনডি ক্রুজের নেতৃত্বে করোনার বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে পুঞ্জিতে কাজ করছেন ফাদার যোসেফ গোমেজ ও এম.আই এবং তার টিম। তিনি বলেন, আমরা এক পুঞ্জি থেকে অন্য পুঞ্জিতে যাচ্ছি, সবাইকে মাস্ক পরা বাধ্যতামুলক করতে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করতে এবং স্বাস্থ্য বিধি নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিচ্ছি। তিনি আরও বলেন, গত কয়েক মাস থেকে পুঞ্জিগুলোতে জনসাধারণের উপাসনার জন্য একত্রিত হওয়া বন্ধ রাখা হয়েছে।

কুবরাজ আন্ত:পুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফ্লোরা বাবলি তালাং বলেন, সিলেট বিভাগে প্রায় ৯০টি পুঞ্জি আছে। এতে প্রায় ৪০ হাজার আদিবাসীর লোকজন বসবাস করেন। বেশিরভাগ এলাকায় পাহাড়ি রাস্তাঘাটে অবস্থা খুবই খারাপ থাকায় এবং বিদ্যুতের ব্যবস্থা না থাকায় এসব এলাকাকে অনেকটু দুর্গম এলাকা বলা চলে। এখানে কোন আধুনিক সুযোগ সুবিধা নেই।

কুলাউড়া ইউএনও এটিএম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, কোভিড-১৯ (করোনা) ইস্যুতে পুঞ্জিবাসীরা আন্তরিক ছিলেন। তাদের কড়া নিয়ম কানুন ও শৃঙ্খলা আমাদেরকে গর্বিত করেছে। আমরা ওদেরকে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন সরকারী স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কার্যক্রম চালাতে সহায়তা করছি। যাতে স্বাস্থ্য বিধি মানা বাধ্যতামূলক করা হয়।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
কারিগরি সহযোগিতায়: শরিফুল ইসলাম
01779911004