পঞ্চগড়ে বার আউলিয়া মাজারে বার্ষিক ওরশ শরীফ

প্রকাশিত: মে ১১, ২০২২

লিহাজ উদ্দিন, পঞ্চগড় : উত্তরের সীমান্ত ঘেষা দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়। চা, পাথর আর সর্ব ফসল সমৃদ্ধ এ অঞ্চলের মুসলিম সম্প্রদায়ের জনগণ অত্যন্ত ধর্মভীরু। তারই জেরে এখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। নানান জীব বৈচিত্র্য, অফুরন্ত ফুল,ফল ও ফসলে ভরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পঞ্চগড়ের আটোয়ারী। উপজেলা সদর হতে ৯ কিঃ মিঃ উত্তর-পূর্বে মির্জাপুর ইউনিয়নের বার আউলিয়া মাজার শরীফ।

দীর্ঘ বেশ কয়েক বছর ধরে প্রতি বাংলা বছরের বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার এখানে ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। করোনার বৈশ্বিক মহামারির কারনে গত দু’বছর এখানে কোন ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয় নি। কিন্ত এবার সেই আগের ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার এখানে ওয়াজ মাহফিল, কোরআন খানি, কবর জিয়ারত ও তবারক বিতরণ এবং ভক্তরা তাদের মানতের টাকা পয়সা, ধান-চাল, মুরগি, কবুতর ও গরু-ছাগল দান করবেন।

বার আউলিয়াদের আগমনের ইতিহাস বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেলেও ওলীদের ইতিহাস রহস্যাবৃত্ত। তাদের লিখিত কোন ইতিহাস আজও পাওয়া যায়নি। বার জন ওলী সুফি সাধক চট্রগ্রামের শহর প্রান্তে প্রথমে এসে আস্তানা স্থাপন করেন। সেই জায়গাটি আজও বার আউলিয়া নামে প্রসিদ্ধ। জানাগেছে, বার জন ওলী খাজাবাবার নির্দেশে চট্রগ্রামসহ পূর্ব বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থান গড়ে তুলে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। পরে স্থল পথে রওয়ানা হয়ে ইসলাম প্রচার করতে করতে উত্তর বঙ্গের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছান এবং পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের বার আউলিয়ায় আস্তানা গড়ে তুলে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। আটোয়ারীর মাটিকে পূর্ণ ভূমিতে পরিণত করার পর সময়ের বিবর্তনে ওলীদের এখানেই সমাহিত করা হয়। গড়ে উঠে বার আউলিয়ার মাজার শরীফ।

মাজার সূত্রে জানা, এই ১২ জন আউলিয়া হলো-
*হেমায়েত আলী শাহ (রঃ)
*নিয়ামত উল্লাহ শাহ (রঃ)
*কেরামত আলী শাহ (রঃ)
*আজহার আলী শাহ (রঃ)
*হাকিম আলী শাহ (রঃ)
*মনছুর আলী শাহ (রঃ)
*মমিনুল শাহ (রঃ)
*শেখ গরীবুল্লাহ (রঃ)
*আমজাদ আলী মোল্লা (রঃ)
*ফরিজ উদ্দিন আখতার (রঃ)
* শাহ মোক্তার আলী (রঃ)
*শাহ অলিউল্লাহ (রঃ)।

স্থানীয় বৃদ্ধ সিরাজুল ইসলাম (৭৫) জানান, মূল মাজারের চারিদিকে বিশাল এলাকা জুড়ে ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। জঙ্গলে বাঘ ভাল্লুক ও বুনো শুকর সহ হিংস্র জীবজন্তু বাস করত। মাজারের উপরের ছনের ঘর ছিল। ওরশের আগের দিন মাটি দিয়ে মাজার শরীফ মোছা হত। কথিত আছে ২টি বাঘ ও ২টি সাপ সব সময় মাজার পাহাড়া দিত। মাজারের পার্শ্বে একটি কাঠের দানবাক্স ছিল। সেখানে ভক্তজনেরা মানতের টাকা-পয়সা ফেলত। কেউ চুরির উদ্দেশ্যে বাক্সের কাছে গেলে সাপ দুটো বের হতো আর খারাপ উদ্দেশ্যে কেউ গেলে বাঘ দুটো বের হত। তবে বসবাসরত খাদেম আলী শাহের স্ত্রী সপ্তাহে একদিন মাটি দিয়ে মাজার মুছতে যেত। এতে বাঘ বা সাপ বের হত না। বর্তমানে সেই গভীর জঙ্গল নেই।

মির্জাপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন বলেন, ১৯৯০ সালের দিকে পঞ্চগড় জেলার তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবুল বাশার আহাম্মদ একদিন জীপ গাড়িতে বার আউলিয়ার মাজার রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠ্যাৎ তার জীপ গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। অনেক চেষ্টার পরেও জীপের ইঞ্জিন চালু না হওয়ায় স্থানীয় লোকজন মাজার শরীফ দেখিয়ে দেন। তিনি তৎক্ষনাৎ ওজু করে মাজার জিয়ারত করেন এবং কোন বেয়াদবি হলে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। প্রার্থনা শেষে জীপে বসে চাবি দিলেই বিনা ধাক্কায় জিপের ইঞ্জিন চালু হয়। ওইদিন রাতেই তিনি ওলীদের দ্বারা স্বপ্নে বার আউলিয়া মাজার উন্নয়নের নির্দেশ পান এবং পরের দিন সকালে তিনি আবার মাজার জিয়ারত করতে আসেন। সেই সঙ্গে তার অসুস্থ্য দুই পুত্রের জন্য মানত করে মাজার উন্নয়নে এগিয়ে আসেন। তার আহ্বানে এলাকায় ব্যাপক সাড়া জাগে এবং প্রথমে তিনি ওলীদের কবরের উপর একটি পাকা দালান নির্মাণ করেন।

উল্লেখ্য হেমায়েত আলী শাহ্ (রঃ) ও নিয়ামত উল্ল্যাহ শাহ (রঃ) একসঙ্গে রয়েছেন, যা জোড়া কবর বলে পরিচিত।

কিছুদিন পর উপজেলার নলপুখুরী গ্রামের মোঃ খলিলুর রহমান অবশিষ্ট ১০ জন ওলীর কবরের প্রতিটি চার পার্শ্বে দেওয়াল নির্মাণ করেন। এরপর তৎকালীন স্পীকার, আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মরহুম মির্জা গোলাম হাফিজের প্রচেষ্টায় প্রায় ৯০ একর জমিতে মাজার কমপ্লেক্স, গোরস্থান, পুকুর, মসজিদ, মাদ্রাসা ও ডাকবাংলো নির্মিত হয় এবং ১০ একর জমিতে খাদেম গণের বাসস্থান রয়েছে।

১৯৯৪ সাল থেকে অদ্যাবধি সরকারী ভাবে পদাধিকার বলে পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক সভাপতি জেলা দায়রা জজ ও পুলিশ সুপার যথাক্রমে সহ-সভাপতি, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সদস্য সচিব, আটোয়ারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার, স্থানীয় (মির্জাপুর) ইউপি চেয়ারম্যান, খাদেম গোষ্ঠির একজন ও স্থানীয় গণ্যমান্য একজন ব্যক্তি নিয়ে মাজার পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কমিটি দায়িত্ব পালন করেন। মাজার শরীফে পবিত্র ওরশ মোবারকের দিন এখানে ওয়াজ মাহফিল, কোরআন খানি, কবর জিয়ারত ও তবারক বিতরণ করা হয় এবং ভক্ত জনরা মানতের টাকা পয়সা, ধান-চাল মুরগি কবুতর ও গরু ছাগল দান করেন। এইদিন মাজারে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল হতে আগত লাখ লাখ ভক্ত ধর্ম প্রাণ মানুষের সমাগম ঘটে।

আটোয়ারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুসফিকুল আলম হালিম জানান, ওরশ মোবারক উপলক্ষে যাবতীয় ব্যবস্থা সুষ্ঠ ভাবে সম্পন্ন করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। সার্বিক পরিস্থিতি ঠিক রাখতে আইন শৃংখলা বাহিনী তৎপর এবং অতিরিক্ত পুলিশের সাথে আনসার সদস্য ও গ্রাম পুলিশ নিযুক্ত থাকবে। আশা করছি ভক্তরা ভালো ভাবে মাজার জিয়ারত ও ওয়াজ মাহফিলে অংশগ্রহণ করতে পারবে।