খুলবে তো ঈশ্বরদী বিমানবন্দর!

>>> গত সাত বছরে এ বিমানবন্দরে কোনো যাত্রীবাহী ফ্লাইট ওঠা-নামা করেনি
>>> আকাশপথ বন্ধ থাকায় বিনিয়োগে অনাগ্রহ
>>> মেগা প্রকল্প এলাকায় বিমানবন্দর বন্ধ রাখা দুঃখজনক
>>> ফ্লাইট চালু করতে রানওয়ের দৈর্ঘ্য বাড়ানো ও উন্নত করা প্রয়োজন
>>> সড়কপথে যানজটে নাজেহাল বিদেশিরা

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেশকিছু উন্নয়ন প্রকল্প চলছে পাবনায়। বিদেশি নাগরিকসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের নিয়মিত যাতায়াত করতে হয় সেখানে। এছাড়া স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক প্রসার ঘটেছে এরই মধ্যে। ঢাকা-চট্টগ্রাম দ্রুত যাতায়াতের জন্য বিমানবন্দরের বিমান পরিবহনের চাহিদা তৈরি হয়েছে। এসব কারণে সাত বছর ধরে বন্ধ থাকা ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি অবিলম্বে খুলে দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এটি চালু হলে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও এয়ারলাইন্স ব্যবসায়ী উভয়ে লাভবান হবে, পাশাপাশি সরকারেরও রাজস্ব আয় হবে বলে মনে করছেন তারা।

২০১৩ সালে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ঈশ্বরদী বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। কিন্তু সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৪ সালে সর্বশেষ ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের ফ্লাইট নেমেছিল পাবনার ঈশ্বরদী বিমানবন্দরে। এরপর আর কোনো যাত্রীবাহী ফ্লাইট এখানে অবতরণ করেনি। দেশের সব বেসরকারি এয়ারলাইন্স কোম্পানি, পাবনা জেলা প্রশাসক ও ঈশ্বরদীবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পরও চালু করা হয়নি বিমানবন্দরটি।

ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি ১৯৪০-১৯৪৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে স্থাপিত হয়। ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী বিমানবন্দরটি ব্যবহার করেছিল। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত নিয়মিত এ বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা করত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এরপর বন্ধ ঘোষণা করা হয় বিমানবন্দরটি। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ২০১৩ সালে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ঈশ্বরদী বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। কিন্তু ছয় মাস ১১ দিন চালু থাকার পর ২০১৪ সালের ২৯ মে আবার বন্ধ হয়ে যায় এটি। গত সাত বছরে এ বিমানবন্দরে কোনো যাত্রীবাহী ফ্লাইট ওঠা-নামা করেনি।

বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নথি থেকে জানা যায়, ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি ১৯৪০-১৯৪৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে স্থাপিত হয়। ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী বিমানবন্দরটি ব্যবহার করেছিল। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত নিয়মিত এ বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা করত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এরপর বন্ধ ঘোষণা করা হয় বিমানবন্দরটি।

দীর্ঘ ১৭ বছর পর ২০১৩ সালে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ঈশ্বরদী বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। কিন্তু ছয় মাস ১১ দিন চালু থাকার পর ২০১৪ সালের ২৯ মে আবার বন্ধ হয়ে যায় এটি। গত সাত বছরে এ বিমানবন্দরে কোনো যাত্রীবাহী ফ্লাইট ওঠা-নামা করেনি। তবে মাঝেমধ্যে বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমানগুলোকে এটি ব্যবহার করতে দেখা গেছে।

পাবনায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সুগারক্রপ রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী ইপিজেড, ডাল গবেষণা কেন্দ্র, রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় অফিস, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, পাবনা সুগার মিল, আলহাজ টেক্সটাইল মিল, পাকশী নর্থ বেঙ্গল পেপার মিল (বর্তমানে বন্ধ), বেনারসি পল্লী, সাত শতাধিক চাল কল, অটো রাইস মিল, অয়েল মিল উল্লেখযোগ্য।

ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি চালু হলে অবশ্যই দেশি-বিদেশি শিল্পোদ্যোক্তারা এখানকার ইপিজেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারবেন। তাদের জন্য আকাশপথে আসা-যাওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে বিমানবন্দরটি দ্রুত চালু করা হোক।

এখানকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প ও ইপিজেড ঘিরে কয়েকশ বিদেশি নাগরিক এখানে বসবাস করছেন। জরুরি প্রয়োজনে ঢাকায় যেতে হলে ভালো কোনো পরিবহন পান না। বিমানবন্দর থাকা সত্ত্বেও সুবিধা নিতে পারছেন না তারা। সড়কপথে যাতায়াতে সময়ক্ষেপণ ও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেকে।

পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সভাপতি সাইফুল আলম স্বপন চৌধুরী বলেন, ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি চালু হলে অবশ্যই দেশি-বিদেশি শিল্পোদ্যোক্তারা এখানকার ইপিজেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারবেন। তাদের জন্য আকাশপথে আসা-যাওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে বিমানবন্দরটি দ্রুত চালু করা হোক।

তিনি আরও বলেন, সড়কপথে এখানে আসতে অনেক সময় লাগে। আকাশপথের সুযোগ থাকলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে উদ্যোক্তারা এখানে বিনিয়োগের আগ্রহ হারাচ্ছেন। দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ চলমান। এমন একটি স্থানের বিমানবন্দর বন্ধ থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক।

বিমানবন্দরটি চালু না থাকায় এখানে কর্মরত বিদেশি নাগরিক বিশেষ করে রাশিয়ানদের সড়কপথে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। রাশিয়া থেকে বিমানে ঢাকায় নামার পর সড়কপথের যানজটে নাজেহাল হতে হচ্ছে তাদের। এ কারণে দ্রুত বিমানবন্দরটি খুলে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

‘আমরা বিভিন্ন সময় ভার্চুয়াল মিটিংয়ে বিমান ও পর্যটনমন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। তিনি আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। এখানকার ব্যবসায়ী সমাজও বিমানবন্দরটি চালুর পক্ষে। এটি চালু হলে এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীরাই বেশি লাভবান হবেন।’

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাইট ইনচার্জ ও প্রিন্সিপাল অ্যাডমিন রুহুল কুদ্দুস বলেন, বিমানবন্দরটি চালু না থাকায় এখানে কর্মরত বিদেশি নাগরিক বিশেষ করে রাশিয়ানদের সড়কপথে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। রাশিয়া থেকে বিমানে ঢাকায় নামার পর সড়কপথের যানজটে নাজেহাল হতে হচ্ছে তাদের। এ কারণে দ্রুত বিমানবন্দরটি খুলে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। এটি চালু হলে শিল্পোদ্যোক্তারাও এখানে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাবেন।

বিমানবন্দর না থাকায় ভোগান্তির বিষয়ে রাশিয়ার জেএসসি এএসই’র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক এলেক্সি ডেইরি বলেন, ‘আমরা ঢাকা-ঈশ্বরদীর মধ্যে বিমান সংযোগ স্থাপনের ধারণাকে সমর্থন করি। এটি আমাদের লোকদের মূল্যবান সময় বাঁচাতে এবং ঝামেলা এড়াতে সহায়তা করবে।’

রাজধানীসহ সারাদেশে কৃষিপণ্য সরবরাহ সহজ হবে
স্থানীয় কৃষিবিদ আরিফ আহমেদ বলেন, ঈশ্বরদী থেকে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন হাট-বাজারে সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি দেশের বাইরেও রফতানি হয় এখানকার কৃষিপণ্য। বিমানব্যবস্থা চালু হলে সরকার এখান থেকে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আদায় করতে পারবে। কারণ, দেশের চাহিদার প্রায় এক-দশমাংশ সবজির উৎপাদন হয় ঈশ্বরদীতে। কৃষিপণ্য সরবরাহের জন্য বিমানবন্দর চালু করলে রাজধানীবাসী সময় মতো টাটকা সবজি ক্রয় করতে পারবেন।

ঈশ্বরদী ও পাবনার উন্নয়নে বিমানবন্দরটি চালু করে দিনে অন্তত একটি-দুটি ফ্লাইট চালুর ব্যবস্থা রাখা দরকার বলে মনে করেন পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু। তিনি বলেন, ঈশ্বরদীর বিমানবন্দরটি চালুর জন্য বারবার কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে ধরনা দিয়েছি, সংসদেও বিষয়টি উপস্থাপন করেছি। তারা আশ্বাস দেওয়ার পরও বিমানবন্দরটি চালু হচ্ছে না। এটি চালু হলে রাজনৈতিক ব্যক্তি ও বড় বড় ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা বেশি উপকৃত হবেন।

ঈশ্বরদীতে নানা প্রকল্প চলমান। সেখানে একটি বিমানবন্দর আছে কিন্তু পরিত্যক্ত। আমরা ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি সচল বিমানবন্দরের উন্নয়নকাজে হাত দিয়েছি। আপাতত সেগুলো আপগ্রেড করা হচ্ছে। এগুলো শেষ হলে ধারাবাহিকভাবে অন্যগুলোর কাজ ধরা হবে

‘বর্তমান সরকারের আমলে এ জেলার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। দেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে পাবনায় বেশি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে এখানে সব কিছুই আছে। শুধু বিমানবন্দরটির অভাব বোধ করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘জরুরি মুহূর্তে ঢাকায় যাওয়ার প্রয়োজন হলে আকাশপথের কোনো বিকল্প নেই। সড়কপথে দীর্ঘ যানজটের কারণে অনেক সময় জরুরি মিটিং মিস করতে হয়। জনস্বার্থে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বাড়াতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিমানবন্দরটি খুলে দেওয়া হোক।’

যে কারণে বন্ধ বিমানবন্দরটি
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি ৪৩৫ একর জায়গার ওপর তৈরি। এর রানওয়ের দৈর্ঘ্য চার হাজার ৭০০ ফুট, প্রস্থে ৭৫ ফুট। বর্তমানে বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সগুলো যে ধরনের উড়োজাহাজ (ড্যাশ- ৮, এটিআর) ব্যবহার করে সেগুলো অবতরণের জন্য ঈশ্বরদী বিমানবন্দর উপযুক্ত নয়। রানওয়ের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ আরও বাড়ানো এবং উন্নত করা প্রয়োজন। এছাড়া বিমানবন্দরটির ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং এর সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টির ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় হবে।

বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বলছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, সৈয়দপুর বিমানবন্দর, কক্সবাজার বিমানবন্দরসহ বেশ কয়েকটি বিমানবন্দরের উন্নয়নকাজ চলমান থাকায় আপাতত ঈশ্বরদী বিমানবন্দর সম্প্রসারণের টাকা নেই তাদের। তাই আপাতত বিমানবন্দরটি খোলার পরিকল্পনাও নেই।

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী বলেন, ‘ঈশ্বরদীতে নানা প্রকল্প চলমান। সেখানে একটি বিমানবন্দর আছে কিন্তু পরিত্যক্ত। আমরা ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি সচল বিমানবন্দরের উন্নয়নকাজে হাত দিয়েছি। আপাতত সেগুলো আপগ্রেড করা হচ্ছে। এ কাজকে এখন প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এগুলো শেষ হলে ধারাবাহিকভাবে অন্যগুলোর কাজ ধরা হবে।’

এ বিষয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান বলেন, ‘ঈশ্বরদী বিমানবন্দর খোলা বা উন্নয়নের বিষয়ে আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই।’

এদিকে, বিমানবন্দরটি খুলে দিলে ঢাকা-ঈশ্বরদী রুটে ফ্লাইট পরিচালনার ইচ্ছা পোষণ করেছে বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলা। এয়ারলাইন্সটির মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে ঈশ্বরদীতে যে রানওয়েটি রয়েছে সেখানে বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সগুলোর বহরে থাকা অত্যাধুনিক এয়ারক্রাফটগুলোর অবতরণের সুযোগ নেই। এছাড়া বিমানবন্দরটির কিছু উন্নয়নমূলক কাজ এখনো বাকি আছে। যদি এটিতে বাংলাদেশের অন্যান্য অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরের মতো সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায় তাহলে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স এ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করবে।